বাংলাদেশের সংবিধান: বিস্তারিত আলোচনা
বাংলাদেশের সংবিধান: বিস্তারিত আলোচনা
Bangladesh-এর সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। স্বাধীনতার পর একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে মৌলিক আইন প্রণীত হয়, সেটিই বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধানে রাষ্ট্রের চরিত্র, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, সরকারি কর্মব্যবস্থা এবং সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে। বর্তমান সরকারি সংকলিত পাঠে সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনের প্রভাবও অন্তর্ভুক্ত আছে।
১. সংবিধান কী?
সংবিধান হলো রাষ্ট্রের মৌলিক ও সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা কী হবে এবং নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য কী—এসব বিষয়ে সংবিধান মূল কাঠামো নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে হবে। একই সঙ্গে সংবিধানকে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ—
জনগণ → রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস → সংবিধান → রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইন।
২. বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পটভূমি
বাংলাদেশের সংবিধান হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম।
প্রধান ঐতিহাসিক ধাপ
- ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
- পূর্ববাংলা পাকিস্তানের পূর্ব অংশ হিসেবে পরিচিত হয়।
- ভাষা, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
- ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে স্বায়ত্তশাসনের দাবি সুস্পষ্ট রূপ পায়।
- ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আরও শক্তিশালী হয়।
- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ ও অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। বর্তমান সংবিধানের প্রস্তাবনাতেও জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক আদর্শের কথা উল্লেখ রয়েছে।
৩. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
বাংলাদেশের সংবিধান ৪ নভেম্বর ১৯৭২ গণপরিষদে গৃহীত হয়।
এরপর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে সংবিধান কার্যকর হয়। সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদে এই কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। একই অনুচ্ছেদে বাংলা পাঠকে প্রামাণিক পাঠ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে; বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধ হলে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পায়।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ
| ঘটনা | তারিখ |
| স্বাধীনতার ঘোষণা | ২৬ মার্চ ১৯৭১ |
| সংবিধান গৃহীত | ৪ নভেম্বর ১৯৭২ |
| সংবিধান কার্যকর | ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ |
৪. সংবিধানের প্রস্তাবনা
সংবিধানের শুরুতে রয়েছে প্রস্তাবনা (Preamble)।
প্রস্তাবনা সংবিধানের ঐতিহাসিক ও আদর্শগত ভিত্তি তুলে ধরে। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মানবাধিকার, আইনের শাসন, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে।
বর্তমান সংবিধানের প্রস্তাবনায় চারটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল আদর্শ উল্লেখ রয়েছে—
- জাতীয়তাবাদ
- সমাজতন্ত্র
- গণতন্ত্র
- ধর্মনিরপেক্ষতা
এগুলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে সংযুক্ত করে সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
৫. সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—
ক. লিখিত সংবিধান
বাংলাদেশের সংবিধান একটি লিখিত সংবিধান। রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বিধানগুলো একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক দলিলে লিপিবদ্ধ।
খ. একক রাষ্ট্রব্যবস্থা
১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র।
অর্থাৎ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র নয়; রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়।
গ. প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র
রাষ্ট্রের নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস জনগণ।
ঘ. সংসদীয় সরকারব্যবস্থা
বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে কেন্দ্র করে নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে এবং মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে দায়ী।
ঙ. মৌলিক অধিকার
সংবিধানের তৃতীয় ভাগে নাগরিকদের বিভিন্ন মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
চ. স্বাধীন বিচার বিভাগ
সংবিধান সুপ্রিম কোর্টসহ বিচার বিভাগের সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণ করেছে।
ছ. সংবিধানের সর্বোচ্চতা
সাধারণ আইন সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গত হলে সাংবিধানিক প্রশ্ন সৃষ্টি হয়; সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।
৬. সংবিধানের কাঠামো
বাংলাদেশের সংবিধান বিভিন্ন ভাগ, অনুচ্ছেদ ও তফসিল নিয়ে গঠিত।
এর প্রধান বিষয়গুলো হলো—
- প্রজাতন্ত্র
- রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
- মৌলিক অধিকার
- নির্বাহী বিভাগ
- আইনসভা
- বিচার বিভাগ
- নির্বাচন
- মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক
- বাংলাদেশের কর্মবিভাগ
- সংবিধান সংশোধন
- বিবিধ ও অন্যান্য বিধান
এছাড়াও সংবিধানে বিভিন্ন তফসিল রয়েছে।
৭. প্রথম ভাগ: প্রজাতন্ত্র
সংবিধানের প্রথম ভাগে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিচয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ১
বাংলাদেশকে একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ২
রাষ্ট্রের সীমানা ও ভূখণ্ডের বিষয়ে বিধান রয়েছে।
অনুচ্ছেদ ২ক
বর্তমান সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বলা হয়েছে এবং একই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের সমঅধিকার ও ধর্ম পালনের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩
রাষ্ট্রভাষা বাংলা।
অনুচ্ছেদ ৭
এখানে জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের সর্বোচ্চতার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৮. রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি রয়েছে।
৪টি প্রধান আদর্শ হলো—
১. জাতীয়তাবাদ
বাংলাদেশের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও জাতীয় চেতনার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২. সমাজতন্ত্র
শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
৩. গণতন্ত্র
জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক অধিকার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ধর্মনিরপেক্ষতা
ধর্মের নামে বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণা এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে এই নীতিগুলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলা হয়েছে। এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান ও অন্যান্য আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নির্দেশক; তবে এগুলো সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়।
৯. মৌলিক অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তৃতীয় ভাগ—মৌলিক অধিকার।
এগুলো নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করে।
প্রধান মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে—
আইনের দৃষ্টিতে সমতা
সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
বৈষম্য নিষিদ্ধ
ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের মতো ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে।
সরকারি চাকরিতে সমতা
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ ও সুযোগের ক্ষেত্রে সমতার নীতি রয়েছে।
জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার
আইন অনুযায়ী জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে সুরক্ষা
কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে।
চলাফেরার স্বাধীনতা
নাগরিকের দেশের অভ্যন্তরে চলাফেরার অধিকার রয়েছে, আইনসঙ্গত সীমাবদ্ধতার অধীন।
সমাবেশের স্বাধীনতা
শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
সংগঠন করার স্বাধীনতা
আইনসঙ্গত উদ্দেশ্যে সংগঠন বা সমিতি গঠনের অধিকার রয়েছে।
চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা
চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত।
ধর্মীয় স্বাধীনতা
নিজ ধর্ম পালন, প্রচার ও অনুশীলনের অধিকার রয়েছে, সাংবিধানিক ও আইনগত সীমার মধ্যে।
১০. মৌলিক অধিকার রক্ষায় আদালতের ভূমিকা
মৌলিক অধিকার শুধু ঘোষণামাত্র নয়। সংবিধান এসব অধিকার রক্ষায় বিচারিক প্রতিকারের ব্যবস্থাও করেছে।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ বা আদেশ দিতে পারে।
এ কারণে মৌলিক অধিকার এবং বিচার বিভাগের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সম্পর্ক রয়েছে।
১১. রাষ্ট্রপতি
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
- রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিনিধিত্ব
- প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ
- নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অন্যান্য সাংবিধানিক পদে নিয়োগ
- সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভঙ্গের সাংবিধানিক কার্যক্রম
- আইন অনুমোদনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ
- ক্ষমা প্রদর্শনের সাংবিধানিক ক্ষমতা
- সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সাংবিধানিক অবস্থান
তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কার্যক্রম সংবিধানে নির্ধারিত কাঠামো ও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১২. প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা
সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সেই সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে প্রতীয়মান হন।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালনা করে।
মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়ী।
এটি সংসদীয় জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতি।
১৩. আইনসভা: জাতীয় সংসদ
বাংলাদেশের আইনসভা হলো জাতীয় সংসদ।
এর প্রধান কাজ—
- আইন প্রণয়ন
- বাজেট অনুমোদন
- সরকারের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
- জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা
- রাষ্ট্রের আর্থিক বিষয় অনুমোদন করা
সংসদের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন।
সংবিধানে নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
১৪. বিচার বিভাগ
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্ট দুটি বিভাগ নিয়ে গঠিত—
- আপিল বিভাগ
- হাইকোর্ট বিভাগ
বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—
- আইন ব্যাখ্যা করা
- নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা
- সাংবিধানিক প্রশ্নের বিচার করা
- বিচারিক প্রতিকার প্রদান করা
- অধস্তন আদালতের ওপর সাংবিধানিক ও আইনগত তত্ত্বাবধানের ভূমিকা পালন করা
সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে।
১৫. নির্বাচনব্যবস্থা
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচনব্যবস্থার জন্য সাংবিধানিক কাঠামো রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।
এর প্রধান কাজ—
- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা
- সংসদ নির্বাচন পরিচালনা
- নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ
- ভোটার তালিকা প্রস্তুত
- নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালন
নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করে।
১৬. স্থানীয় সরকার
সংবিধানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থারও স্বীকৃতি রয়েছে।
গ্রাম, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী গঠিত হয়।
স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে জনগণের স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
১৭. বাংলাদেশের নাগরিকত্ব
সংবিধানে নাগরিকত্ব সম্পর্কেও বিধান রয়েছে।
নাগরিকত্বের বিষয়টি সংবিধান এবং সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
নাগরিকত্ব রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে একটি সাংবিধানিক ও আইনগত সম্পর্ক তৈরি করে।
১৮. সরকারি কর্মব্যবস্থা
রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সাংবিধানিক অবস্থানও সংবিধানে নির্ধারিত হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- সরকারি চাকরিতে নিয়োগ
- কর্মের শর্ত
- সরকারি কর্ম কমিশন
- প্রশাসনিক কাঠামো
- সরকারি কর্মচারীদের সাংবিধানিক অবস্থান
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (BPSC) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।
১৯. মহাহিসাব–নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক
রাষ্ট্রের সরকারি অর্থের হিসাব ও ব্যয়ের ওপর সাংবিধানিক নিরীক্ষা নিশ্চিত করার জন্য মহাহিসাব–নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (Comptroller and Auditor General) পদ রয়েছে।
সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
২০. সংবিধান সংশোধন
সংবিধান একটি স্থির দলিল নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে।
১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে। সংসদ আইন দ্বারা সংবিধানের বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিত করার মাধ্যমে সংশোধন করতে পারে, তবে নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
২১. বাংলাদেশের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে বহুবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথম সংশোধনী, ১৯৭৩
যুদ্ধাপরাধসহ আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের সাংবিধানিক ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন আনা হয়।
চতুর্থ সংশোধনী, ১৯৭৫
রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়।
পঞ্চম সংশোধনী, ১৯৭৯
১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ের কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তনকে বৈধতা দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
সপ্তম সংশোধনী, ১৯৮৬
সামরিক শাসনামলের কিছু কার্যক্রমের সাংবিধানিক বৈধতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
দ্বাদশ সংশোধনী, ১৯৯১
সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ভূমিকার কাঠামো পরিবর্তিত হয়। ১১ অনুচ্ছেদেও সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের বিষয়টি যুক্ত হয়।
ত্রয়োদশ সংশোধনী, ১৯৯৬
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করা হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী, ২০১১
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল ও বিভিন্ন সাংবিধানিক বিষয়সহ একাধিক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনা হয়। সরকারি সংবিধান-পাঠে এসব সংশোধনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
২২. সংবিধানের মৌলিক কাঠামো
সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের কিছু মৌলিক বিষয়কে সংশোধনের অযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগের নির্দিষ্ট বিধান এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ধারণা হলো—
সংবিধান পরিবর্তনযোগ্য হলেও এর মৌলিক কাঠামো রক্ষার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়টি বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইন ও বিচারব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
২৩. সংবিধান ও আইনের শাসন
সংবিধানের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
আইনের শাসনের অর্থ হলো—
- ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়;
- রাষ্ট্রের ক্ষমতা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ;
- নাগরিকের অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত;
- রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থাকতে হবে;
- বিচার বিভাগ আইনের ব্যাখ্যা ও অধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালন করবে।
২৪. সংবিধান ও মানবাধিকার
বাংলাদেশের সংবিধানে মানবমর্যাদা, সমতা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ধারণাকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রের লক্ষ্য হিসেবে মানবাধিকার ও স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারগুলোকে অধিকতর নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
২৫. সংবিধানের তফসিল
সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদের পাশাপাশি তফসিলগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
বিশেষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ঐতিহাসিক দলিল সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বর্তমান সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদের অধীনে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিলে যথাক্রমে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার টেলিগ্রাম এবং ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উল্লেখ রয়েছে।
২৬. সংবিধানের গুরুত্ব
বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবিধানের গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।
১. রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারণ করে
বাংলাদেশ কী ধরনের রাষ্ট্র—তা সংবিধান নির্ধারণ করে।
২. জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে
রাষ্ট্রক্ষমতার মূল উৎস জনগণ—এই ধারণা সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত।
৩. নাগরিক অধিকার রক্ষা করে
মৌলিক অধিকার নাগরিককে রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়।
৪. রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর ক্ষমতা নির্ধারণ করে
আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
৫. ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে
কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অসীম ক্ষমতার অধিকারী নয়।
৬. গণতন্ত্রের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করে
নির্বাচন, সংসদ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির কাঠামো তৈরি করে।
৭. আইনের শাসন নিশ্চিত করার ভিত্তি দেয়
রাষ্ট্র পরিচালনাকে সংবিধান ও আইনের অধীন রাখে।
২৭. পরীক্ষার জন্য সংক্ষিপ্তসার
বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে মনে রাখার মতো বিষয়গুলো—
| বিষয় | তথ্য |
| সংবিধান গৃহীত | ৪ নভেম্বর ১৯৭২ |
| কার্যকর | ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ |
| রাষ্ট্রের নাম | গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ |
| রাষ্ট্রের ধরন | একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র |
| রাষ্ট্রভাষা | বাংলা |
| রাষ্ট্রধর্ম | ইসলাম |
| রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি | জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা |
| আইনসভা | জাতীয় সংসদ |
| সর্বোচ্চ আদালত | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট |
| সুপ্রিম কোর্টের বিভাগ | আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ |
| সাংবিধানিক নির্বাচন প্রতিষ্ঠান | নির্বাচন কমিশন |
| মৌলিক অধিকার | তৃতীয় ভাগ |
| রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি | দ্বিতীয় ভাগ |
| সংবিধান সংশোধন | ১৪২ অনুচ্ছেদ |
| সংবিধানের সর্বোচ্চতা | ৭ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক কাঠামো |
| কার্যকর সংবিধানের ভাষা | বাংলা প্রামাণিক পাঠ |
উপসংহার
বাংলাদেশের সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আইনগত দলিল নয়; এটি স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, জনগণের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর সাংবিধানিক ভিত্তি। ১৯৭২ সালে প্রণীত এই সংবিধান পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বহুবার সংশোধিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সংবিধান বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক পটভূমি, প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ, নির্বাচনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংশোধনী—সবগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে দেখা প্রয়োজন।