উপসর্গ কাকে বলে|| উপসর্গ কি।উপসর্গ কত প্রকার ও কি কি।উদাহরনসহ ব্যাখ্যা কর।
উপসর্গের সংজ্ঞা:
যেসব বর্ণ বা বর্ণের সমষ্টি ধাতু এবং শব্দের পূর্বে বসে সাধিত শব্দের অর্থের পরিবর্তন, সম্প্রসারণ কিংবা সংকোচন ঘটায়, তাদেরকে বলা হয় উপসর্গ।
যেমন—প্র, পরা, পরি, নির ইত্যাদি।
উপসর্গ’ কথাটির মূল অর্থ ‘উপসৃষ্ট’। এর কাজ হলো নতুন শব্দ গঠন করা। উপসর্গের নিজস্ব কোন অর্থ নেই, তবে এগুলো অন্য শব্দের সাথে যুক্ত হয়ে বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে থাকে। মনে রাখতে হবে, উপসর্গ সব সময় মূল শব্দ বা ধাতুর পূর্বে যুক্ত হয়।
তাপ’ (বিশেষ্য পদ) তৎসম পদ। ‘তাপ’ অর্থ উষ্ণতা বা উত্তাপ। এর পূর্বে ‘প্র’ বা ‘অনু’ যুক্ত হয়ে যথাক্রমে প্রতাপ (প্র+তাপ) যার অর্থ পরাক্রান্ত বা বীরত্ব।
অনুতাপ (অনু+ তাপ) যার অর্থ অনুশোচনা বা আফসোস ইত্যাদি নতুন শব্দ গঠিত হয়েছে এবং ‘তাপ’ শব্দের অর্থের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
আবার ‘প্র’ বা ‘অনু’ এর নিজস্ব কোন অর্থ নেই বা এগুলো স্বাধীনভাবে কোন বাক্যেও ব্যবহৃত হতে পারে না। তাই ভাষাবিদগণ এরূপ অব্যয়সূচক শব্দ বা শব্দাংশের নাম দিয়েছেন ‘উপসর্গ’। যেমন- ‘হার’ একটি শব্দ। এর সাথে উপ, আ, প্র, বি উপসর্গ যুক্ত হয়ে যথাক্রমে উপহার, আহার, প্রহার, বিহার শব্দ গঠিত হয়েছে। এভাবে উপসর্গের সাহায্যে নতুন নতুন শব্দ গঠন করে বাংলা ভাষার শব্দ সম্ভার সমৃদ্ধি লাভ করেছে।
অতএব, কতকগুলো অব্যয় নামবাচক বা কৃদান্ত শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে এবং অর্থের পরির্বতন সাধন করে, এগুলোকে উপসর্গ বলে।
●ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “সংস্কৃতে কতগুলো অব্যয় শব্দ আছে, এগুলো ধাতুর পূর্বে বসে এবং ধাতুর মূল ক্রিয়ার গতি নির্দেশ করে এর অর্থের প্রসারণ, সঙ্কোচন বা অন্য পরিবর্তন আনয়ন করে দেয়। এরূপ অব্যয় শব্দকে উপসর্গ বলে।”
●ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে, “যেসব অব্যয় শব্দ কৃদান্ত বা নামপদের পূর্বে বসে শব্দগুলোর অর্থের সংকোচন, সম্প্রসারণ বা অন্য কোন পরিবর্তন সাধন করে, ঐ সব অব্যয় শব্দকে বাংলা ভাষায় উপসর্গ বলে।”
●অশোক মুখোপাধ্যায়ের মতে, “বাংলা ভাষায় কিছু অব্যয় আছে যারা ধাতু বা শব্দের আগে যুক্ত হয়ে তাদের অর্থ বদল করে দেয়। এদেরই বলা হয় উপসর্গ।”
উপসর্গের প্রকারভেদ:
উপসর্গ তিন প্রকার: যেমন–
(১) বাংলা উপসর্গ,
(২) সংস্কৃতি উপসর্গ,
(৩) বিদেশ উপসর্গ।
১) বাংলা উপসর্গ: বাংলা উপসর্গ মোট ২১টি।
এগুলো হলো— অ, অঘা, অজ, অনা, আ, আত, আন, আব, ইতি, ওন, কদ, কু, নি, পাতি, বি, তব, রাম, স, সা, সু, হা।
উদাহরণ:
অ — অকাজ, অমিল, অপয়া।
অনা — অনাচার, অনাবৃষ্টি, অনাদায়
অঘা — অঘারাম, অঘাচণ্ডী ইত্যাদি।
২) সংস্কৃত উপসর্গ: বাংলা ভাষায় ব্যবহূত সংস্কৃত উপসর্গ ২০টি।
যেমন: প্র, পরা, অপ, সম, নি, অব, অনু, নির, দুর, বি, অধি, সু, উৎ, পরি, প্রতি, অভি, অতি, আপ, উপ, আ।
উদাহরণ:
প্র — প্রহার, প্রকৃষ্ট, প্রবাহ, প্রবোধ
পরা — পরাজয়, পরাহত
অপ — অপমান, অপবাদ, অপব্যাখ্যা ইত্যাদি।
| উপসর্গ | অর্থ | উদাহরণ |
| প্র | অগ্র, সামনে | প্রগতি, প্রচার |
| পরা | দূরে | পরাজয় |
| অপ | মন্দ, দূরে | অপকর্ম |
| সম্ | একত্র | সম্মিলন |
| নি | নিচে, ভিতরে | নিবাস |
| অব | নিচে | অবনতি |
| অনু | অনুসরণ | অনুসরণ |
| নির্/নিঃ | বিহীন | নির্ভয়, নিঃস্ব |
| দুর্/দুঃ | মন্দ | দুর্ভাগ্য |
| বি | পৃথক, বিশেষ | বিজ্ঞান, বিজয় |
| অধি | উপর | অধিকার |
| সু | উত্তম | সুপথ |
| উৎ/উদ্ | উপরে | উন্নতি |
| অতি | অধিক | অতিরিক্ত |
| অভি | দিকে | অভিযান |
| প্রতি | প্রত্যেক, বিপরীত | প্রতিদিন |
| পরি | চারদিকে | পরিভ্রমণ |
| উপ | নিকট | উপকার |
| আ | পর্যন্ত | আগমন |
| অপি | সংযুক্ত | (বর্তমানে খুব কম ব্যবহৃত) |
সংস্কৃত উপসর্গের উদাহরণ
| শব্দ | বিশ্লেষণ |
| উপকার | উপ + কার |
| প্রগতি | প্র + গতি |
| সুশিক্ষা | সু + শিক্ষা |
| দুর্নীতি | দুর্ + নীতি |
| অতিবৃষ্টি | অতি + বৃষ্টি |
| পরিভ্রমণ | পরি + ভ্রমণ |
| অবনতি | অব + নতি |
| অধিকার | অধি + কার |
৩. বিদেশি উপসর্গ
আরবি, ফারসি, ইংরেজি ইত্যাদি ভাষা থেকে আগত উপসর্গকে বিদেশি উপসর্গ বলে।
(ক) ফারসি উপসর্গ
| উপসর্গ | উদাহরণ |
| বে | বেকার, বেআইনি |
| বদ | বদভ্যাস |
| না | নালায়েক |
| গর | গরহাজির |
| দর | দরবার |
(খ) আরবি উপসর্গ
| উপসর্গ | উদাহরণ |
| আল | আলহাজ |
| বিল | বিলকুল |
(গ) ইংরেজি উপসর্গ
| উপসর্গ | উদাহরণ |
| সাব | সাব-ইন্সপেক্টর |
| ভাইস | ভাইস-চ্যান্সেলর |
| এক্স | এক্স-প্রেসিডেন্ট |
| কো | কো-অপারেটিভ |
উপসর্গের বৈশিষ্ট্য
১. উপসর্গ সর্বদা শব্দের আগে বসে।
২. উপসর্গের স্বাধীন অর্থ নেই।
৩. এটি মূল শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে।
৪. নতুন শব্দ গঠন করে।
৫. উপসর্গ নিজে কোনো পদ নয়।
৬. একাধিক উপসর্গ একই মূল শব্দের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
উদাহরণ:
| উপসর্গ | মূল শব্দ | নতুন শব্দ |
| অ | সুখ | অসুখ |
| সু | শিক্ষা | সুশিক্ষা |
| দুর্ | ভাগ্য | দুর্ভাগ্য |
| প্র | গতি | প্রগতি |
| উপ | দেশ | উপদেশ |
উপসর্গের কাজ
উপসর্গ মূলত—
- নতুন শব্দ তৈরি করে।
- মূল শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে।
- অর্থকে বিশেষ বা সীমাবদ্ধ করে।
- শব্দের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করে।
একই মূল শব্দে বিভিন্ন উপসর্গ
| মূল শব্দ | উপসর্গযুক্ত শব্দ | অর্থ |
| বিচার | অবিচার | অন্যায় বিচার |
| বিচার | সুবিচার | ন্যায়বিচার |
| বিচার | পুনর্বিচার | আবার বিচার |
| দেশ | উপদেশ | পরামর্শ |
| দেশ | বিদেশ | অন্য দেশ |
| দেশ | স্বদেশ | নিজের দেশ |
উপসর্গ ও প্রত্যয়ের পার্থক্য
| উপসর্গ | প্রত্যয় |
| শব্দের আগে বসে | শব্দের পরে বসে |
| অর্থ পরিবর্তন করে | নতুন পদ বা শব্দ গঠন করে |
| স্বাধীন অর্থ নেই | সাধারণত স্বাধীন অর্থ থাকে না |
| যেমন: সু + শিক্ষা = সুশিক্ষা | বিদ্যা + আর্থী = বিদ্যার্থী |
পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গযুক্ত শব্দ
- সুবিচার
- অবিচার
- সুশিক্ষা
- দুর্নীতি
- দুর্ভিক্ষ
- প্রতিদিন
- প্রতিযোগিতা
- অভিযান
- উন্নতি
- অতিরিক্ত
- উপদেশ
- উপকার
- পরিভ্রমণ
- অনুসরণ
- অধিকার
- নির্ভয়
- নিঃস্ব
- প্রগতি
- সমবায়
- বিজ্ঞান
মনে রাখার সহজ কৌশল
- উপসর্গ আগে, প্রত্যয় পরে।
- সংস্কৃত উপসর্গ = ২০টি (পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)।
- উপসর্গের নিজস্ব স্বাধীন অর্থ নেই।
- উপসর্গ মূল শব্দের অর্থ পরিবর্তন বা সম্প্রসারণ করে।