ক্রিয়ার কাল

ক্রিয়ার কাল কাকে বলে? ক্রিয়ার কাল কত প্রকার ও কি কি?

ক্রিয়ার কাল কাকে বলে? ক্রিয়ার কাল কত প্রকার ও কি কি?


ক্রিয়ার কাল কাকে বলে :-

ক্রিয়া অর্থ কাজ। ‘কাল’ কথাটির অর্থ সময়। ক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার সময়কে ক্রিয়ার কাল বলে। যেমন –
আমি বই পড়ছি – ক্রিয়াটি বর্তমানে সংঘটিত হচ্ছে।

আমি বই পড়েছিলাম – ক্রিয়াটি অতীতে সম্পন্ন হয়েছে।
আমি বই পড়বো – ক্রিয়াটি ভবিষ্যতে সম্পন্ন হবে।

ওপরের বাক্য তিনটিতে ক্রিয়া পদগুলো নিষ্পন্ন হবার বিভিন্ন সময় বোঝানো হয়েছে। প্রথম বাক্যে ‘পড়ছি’ ক্রিয়াটি বর্তমান সময়ে নিষ্পন্ন হয়। দ্বিতীয় বাক্যে ‘পড়েছিলাম’ ক্রিয়াটি পূর্বে বা অতীতে সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় বাক্যে ‘পড়বো’ ক্রিয়াটি যারা কাজটি পরে বা ভবিষ্যতে সম্পন্ন হবে এমন ভাব প্রকাশ পেয়েছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, মনোভাব প্রকাশের জন্য বাক্যের ক্রিয়াপদ বিভিন্ন সময় বা কালে সম্পন্ন হওয়া নির্দেশ করে থাকে। ক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার এই সময় বা কালকে ক্রিয়ার কাল বলে।

ক্রিয়ার কাল কয় প্রকার ও কি কি :-

ক্রিয়ার কাল প্রধানত তিন প্রকার। যথা-
১. বর্তমান কাল
২. অতীত কাল ও
৩. ভবিষ্যৎ কাল।

এখন আমরা এই তিন প্রকার কাল কাকে বলে ও তাদের শ্রেনীবিভাগ সম্পর্কে আলোচনা করব।

বর্তমান কাল কাকে বলে :-

যে ক্রিয়া এখন সম্পন্ন হয় বা হচ্ছে বুঝায়, তাকে বর্তমান কাল বলে। যেমন:

  • আমি পড়ি।
  • সে যায়।
  • কাকলি দৌড়ায়।

বর্তমান কালের প্রকারভেদ :-

১. নিত্য বা সাধারণ বর্তমান :-
সাধারণভাবে যে ক্রিয়া বর্তমানে ঘটে, বা নিত্যই ঘটে, তাকে বলা হয় নিত্য-বর্তমান।
এই কাল বুঝাতে ধাতুর সঙ্গে ই, অ, এন, ইস্, এ ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন :
সে হাসে। আমি পড়ি। সূর্য ওঠে। মানুষ মরে। বাতাস বয়।

২. ঘটমান বর্তমান :-
বর্তমানে যে ক্রিয়ার কাজ আরম্ভ হয়েও শেষ হয়নি, অর্থাৎ যে-ক্রিয়ার কাজ এখনও চলছে, তাকে বলা হয় ঘটমান বর্তমান।

এই কাল বুঝাতে ধাতুর শেষে ইতেছে’ (ছে), ইতেছ (ছ), ইতেছি (ছি) প্রভৃতি ক্রিয়া-বিভক্তি বসে। সাধুভাষায় ইতেছে, ইতেছ, ইতেছি এবং চলিতভাষায় ছে, ছ, ছি প্রভৃতি ক্রিয়া-বিভক্তি বসে। যদিও বর্তমানে চলিতভাষা প্রাধান্য পেয়েছে, তবুও সাধুভাষায় ক্রিয়া-বিভক্তির রূপগুলি জানা প্রয়োজন।
বন্ধনীর মধ্যে চলিতভাষার ক্রিয়ারুপ দেখানো হয়েছে। যেমন :

সে হাসিতেছে (হাসছে)‌।

তুমি কাঁদিতেছ, (কাঁদছ)।

আমি পড়িতেছি (পড়ছি)।

সূর্য উঠিতেছে (উঠছে) ইত্যাদি।

৩. পুরাঘটিত বর্তমান :-
কিছুক্ষণ পূর্বে যে ক্রিয়া সংঘটিত হয়েছে, অথচ যার ফল এখনও বর্তমান, তার কালকে বলা হয় পুরাঘটিত বর্তমান।
এই কাল বুঝাতে ধাতুর শেষে ইয়াছে (এছে), ইয়াছ (আছ), ইয়াছি (এছি) প্রভৃতি ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়।
যেমন : 

সে হাসিয়াছে (হেসেছে)।

তুমি কাঁদিয়াছ (কেঁদেছ)‌।

আমি পড়িয়াছি (পড়েছি) ইত্যাদি।

৪. বর্তমান–অনুজ্ঞা :-
আদেশ, নির্দেশ, উপদেশ, প্রার্থনা, অনুমতি প্রভৃতি অর্থে যে ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়, তাকে বলে অনুজ্ঞা, ওই ক্রিয়া বর্তমান কালের হ’লে তাকে বর্তমান-অনুজ্ঞা বলে। অনুজ্ঞায় উত্তম পুরুষের কোনও রূপ নাই। যেমন :
এক্ষুনি যাও। 

অবিলম্বে প্রস্থান করুন। 

চলে যা বলছি।

অতীত কাল কাকে বলে :-

যে ক্রিয়া আগেই সম্পন্ন হয়েছে, তার কালকে অতীত কাল বলে। যেমন:

আমি তাকে দেখেছিলাম।
গতকাল ঢাকা গিয়েছিলাম।
মা রান্না করছিলেন।

অতীত কালের প্রকারভেদ :-

অতীত কালকে চারভাগে ভাগ করা যায়।
যেমন –
১.নিত্য-অতীত;
২. ঘটমান অতীত;
৩. পুরাঘটিত অতীত এবং
৪. নিত্যবৃত্ত-অতীত।

১. নিত্য বা সাধারণ অতীত কাকে বলে :-
সাধারণভাবে যে-ক্রিয়ার কাজ পূর্বে অর্থাৎ, অতীতে সম্পূর্ণ হয়েছে তার কালকে বলা হয় নিত্য-অতীত। এতে নির্দিষ্ট কোনো সময়ের উল্লেখ থাকে না। তবে বাক্য থেকে বুঝা যায় যে, এই শ্রেণির কাজ খুব বেশি পূর্বে নিষ্পন্ন হয়নি।
এই কাল বুঝাতে ধাতুর শেষে-ইলাম (লাম), ইলে (লে), ল প্রভৃতি ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন :
হেনা গান গাহিল (গাইল)। 

আমি একটি গল্প লিখিলাম (লিখলাম)। 

বাবা বাজার হইতে (থেকে) আসিলেন (এলেন)।

২. ঘটমান অতীত কাকে বলে :-
পূর্বে যে-ক্রিয়ার কাজ হচ্ছিল এবং তখনও যা সম্পূর্ণ হয়নি, তার কালকে বলা হয় ঘটমান অতীত।
এই কাল বুঝাতে ধাতুর শেষে- ইতেছিলাম (ছিলাম), -ইতেছিলে (ছিলে). ইতেছিল (ছিল) ইত্যাদি ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন :হেনা গান গাহিতেছিল (গাইছিল, গাচ্ছিল)। 

আমি একটি গল্প লিখিতেছিলাম (লিখছিলাম)। 

বাবা বাজার হইতে (থেকে) আসিতেছিলেন (আসছিলেন)।
৩. পুরাঘটিত–অতীত :
অনেক পূর্বেই যে ক্রিয়ার কাজ ঘটেছিল, তাকে বলা হয় পুরাঘটিত-অতীত।
এই ঝাল বুঝাতে ধাতুর শেষে ইয়াছিল (এছিল), ইয়াছিলাম (এছিলাম), ইয়াছিলে (-এছিলে) ইত্যাদি ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন :
হেনা গান গাহিয়াছিল (গেয়েছিল)। 

আমি একটি গল্প লিখিয়াছিলাম (লিখেছিলাম)। 

তখন বাবা বাজার থেকে আসিয়াছিলেন (এসেছিলেন)।

৪. নিত্যবৃত্ত অতীত :
পূর্বে যে ক্রিয়ার কাজ কিছুকাল ধরে চলত বা নিয়মিত ভাবে যে ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হত, তার কালকে বলা হয় নিত্যবৃত্ত অতীত।
এই কাল বুঝাতে ধাতুর শেষে-ইত (-ত), ইতাম (-তাম), ইতে (-তে) ইত্যাদি ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমনঃ
প্রত্যহ সকালে হেনা সঙ্গীতচর্চা করিত (রোজ সকালে হেনা গানের রেওয়াজ করত)। 

আমি যখন ঘুম হইতে উঠিতাম (আমি যখন ঘুম থেকে উঠতাম)। 

বাবা তখন প্রাতর্জ সারিয়া বাড়িতে ফিরিতেন।

ভবিষ্যৎ কাল কাকে বলে :-

যে ক্রিয়া আগামীতে বা ভবিষ্যতে সম্পন্ন হবে এমন বোঝায়, তার কালকে ভবিষ্যৎ কাল বলে। যেমন:
বৃষ্টি আসবে।
সীমা কাল গান গাইবে।
পার্থ নাচবে।

ভবিষ্যৎ কালের শ্রেনীবিভাগ :-

ভবিষৎ কালকেও চার ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১. সাধারণ ভবিষ্যৎ,
২. ঘটমান ভবিষ্যৎ,
৩. পুরাঘটিত-ভবিষ্যৎ এবং
৪. ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা।

১. সাধারণ ভবিষ্যৎ :-
পরে অর্থাৎ ভবিষ্যতে যে ক্রিয়ার কাজ অনুষ্ঠিত হবে, তার কালকে বলা হয় সাধারণ ভবিষ্যৎ।
এই কাল বুঝাতে ধাতুর শেষে হবে -ইব (-ব), (-বে) ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমনঃ
কাল পরীক্ষা হইবে (হবে)। 

আমি তোমার গান শুনিব (শুনব)। 

বাবা বেড়াইতে যাইবেন (বেড়াতে যাবেন)।
২. ঘটমান ভবিষ্যৎ :-
পরে যে ক্রিয়া ঘটতে থাকবে, তার কালকে বলা হয় ঘটমান-ভবিষ্যৎ।
এই কাল বুঝাতে মূল ধাতুর শেষে-ইতে (-তে) ক্রিয়া-বিভক্তি এবং তার পরে আছ (থাক্) ধাতুর সাথে -ইব (-ব), ইবে (-বে), ইবি (-বি) ইত্যাদি ক্রিয়া-বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমনঃ
সে তখন হাঁটিতে থাকিবে (হাঁটতে থাকবে)। 

আমি যখন লিখিতে থাকিব (লিখতে থাকব)।

পাশের বাড়িতে তখন কাসরঘণ্টা বাজিতে থাকিবে (বাজতে থাকবে)।
৩. পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ :-
পূর্বে যে ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়ে থাকবে, তার কাল হয় পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ। যেমন :
আপনি সেদিন আমাকে ভুল বুঝিয়া থাকিবেন (বুঝে থাকবেন)। সেই হয়তো লিখিয়া থাকিবে (লিখে থাকবে) ইত্যাদি।

৪. ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা কাকে বলে :-
ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার আদেশ, অনুরোধ, উপদেশ, প্রার্থনা প্রভৃতি বোঝালে ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়াপদের যে রূপ হয়, তাকে ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা বলে। যেমন –
আদেশ – এই লেখাটি তুমিই লিখবে।

  • অনুরোধ – আমার জন্য একটি বই আনবেন।
  • উপদেশ – মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করবে।
  • প্রার্থনা – রেখো মা, দাসেরে মনে এ মিনতি করি পদে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *