বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা: বিস্তারিত আলোচনা

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা: বিস্তারিত আলোচনা


বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা মূলত সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো বুঝতে হলে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা, জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় সরকার—এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা জরুরি।


১. বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—

  1. সংসদীয় সরকারব্যবস্থা
  2. একক বা Unitary রাষ্ট্রব্যবস্থা
  3. গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র
  4. জনগণের সার্বভৌমত্ব
  5. রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান
  6. প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান
  7. মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে দায়ী
  8. এককক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ
  9. স্বাধীন বিচার বিভাগের সাংবিধানিক কাঠামো
  10. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন
  11. মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের স্বীকৃতি

২. সংসদীয় সরকারব্যবস্থা

বাংলাদেশে বর্তমানে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা কার্যকর।

১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি-প্রধান নির্বাহী ব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।

এই ব্যবস্থায় দুটি পদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—

  • রাষ্ট্রপতি — রাষ্ট্রপ্রধান
  • প্রধানমন্ত্রী — সরকারপ্রধান

রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী সরকারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁর কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হয়।


৩. রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতির অবস্থান

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রপ্রধান।

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতির প্রধান সাংবিধানিক ভূমিকার মধ্যে রয়েছে—

  • রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিনিধিত্ব;
  • প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ;
  • অন্যান্য সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন;
  • সংসদ-সংক্রান্ত কিছু সাংবিধানিক কার্যক্রম;
  • বিভিন্ন পদে সাংবিধানিক নিয়োগ;
  • ক্ষমা প্রদর্শনের সাংবিধানিক ক্ষমতা;
  • সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সাংবিধানিক অবস্থান।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমা

বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর অন্যান্য কার্যাবলি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করেন।

অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ হলেও তিনি সরকারের দৈনন্দিন নির্বাহী কার্যক্রমের প্রধান নন।


৪. প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারপ্রধান এবং নির্বাহী বিভাগের প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তি।

সংবিধানের ৫৬(৩) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সেই সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন লাভ করেন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রধান ভূমিকা

  • সরকারের নেতৃত্ব দেওয়া
  • মন্ত্রিসভা গঠন ও পরিচালনা
  • সরকারি নীতি নির্ধারণে নেতৃত্ব দেওয়া
  • প্রশাসনের কার্যক্রম সমন্বয় করা
  • সংসদের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা
  • রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির বিষয়ে অবহিত করা

সংবিধানের ৫৫(২) অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁর কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হয়।


৫. মন্ত্রিসভা

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।

সংবিধানের ৫৫(১) অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।

মন্ত্রীদের মধ্যে থাকতে পারেন—

  • পূর্ণমন্ত্রী
  • প্রতিমন্ত্রী
  • উপমন্ত্রী

সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এসব মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। তবে কমপক্ষে নয়-দশমাংশ মন্ত্রী সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগ করতে হয়; সর্বোচ্চ এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নেওয়া যেতে পারে।


৬. মন্ত্রিসভার যৌথ দায়িত্ব

সংসদীয় সরকারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মন্ত্রিসভার যৌথ দায়িত্ব।

সংবিধানের ৫৫(৩) অনুযায়ী—

মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী।

এর অর্থ হলো সরকারকে সংসদের আস্থা বজায় রাখতে হয়।

যদি প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারান, সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা নির্দিষ্ট সাংবিধানিক শর্তে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিতে হবে।


৭. জাতীয় সংসদ

বাংলাদেশের আইনসভা হলো জাতীয় সংসদ।

সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে এবং প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

সংসদের প্রধান কাজ

১. আইন প্রণয়ন

দেশ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করা সংসদের অন্যতম প্রধান কাজ।

২. বাজেট অনুমোদন

সরকারের আয়-ব্যয় ও জাতীয় বাজেটের ওপর সংসদের সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে।

৩. সরকারের জবাবদিহি

সংসদে প্রশ্ন, আলোচনা ও বিভিন্ন সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে জবাবদিহি তৈরি হয়।

৪. জনগণের প্রতিনিধিত্ব

সংসদ সদস্যরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে জনগণের স্বার্থ উপস্থাপন করেন।


৮. জাতীয় সংসদের গঠন

সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনে ৩০০টি আসনে সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হন। এর পাশাপাশি সংবিধানে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থাও রয়েছে। বর্তমান সাংবিধানিক পাঠে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান রয়েছে, যা সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়।


৯. সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার

জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে—

  • স্পিকার
  • ডেপুটি স্পিকার

নির্বাচিত হন।

স্পিকার সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করেন এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।


১০. বিরোধী দলের ভূমিকা

সংসদীয় গণতন্ত্রে শুধু সরকার নয়, বিরোধী দলেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিরোধী দল—

  • সরকারের নীতির সমালোচনা করতে পারে;
  • বিকল্প নীতি তুলে ধরতে পারে;
  • সংসদে প্রশ্ন করতে পারে;
  • বিভিন্ন জাতীয় বিষয়ে আলোচনা করতে পারে;
  • সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ কারণে কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।


১১. বিচার বিভাগ

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো বিচার বিভাগ।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হলো সুপ্রিম কোর্ট।

এটি দুটি বিভাগ নিয়ে গঠিত—

  1. আপিল বিভাগ
  2. হাইকোর্ট বিভাগ

বিচার বিভাগের প্রধান কাজ

  • আইন ব্যাখ্যা করা
  • বিরোধ নিষ্পত্তি করা
  • মৌলিক অধিকার রক্ষা করা
  • সাংবিধানিক প্রশ্নের বিচার করা
  • বেআইনি সরকারি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার প্রদান করা

বিশেষ করে হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ বা আদেশ দিতে পারে।


১২. ক্ষমতার বিভাজন

আধুনিক গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় সাধারণভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে তিনটি প্রধান অঙ্গে ভাগ করা হয়—

আইনসভা

জাতীয় সংসদ

কাজ: আইন প্রণয়ন।

নির্বাহী বিভাগ

রাষ্ট্রপতি + প্রধানমন্ত্রী + মন্ত্রিসভা + প্রশাসন

কাজ: আইন বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনা।

বিচার বিভাগ

সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালত

কাজ: আইন ব্যাখ্যা ও বিচারকার্য পরিচালনা।

তবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা কঠোরভাবে সম্পূর্ণ পৃথকীকরণের বদলে পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের ওপরও নির্ভর করে।


১৩. নির্বাচন কমিশন

গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

এর গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে—

  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা;
  • জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা;
  • ভোটার তালিকা প্রস্তুত;
  • নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ;
  • নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালন।

নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক অবস্থান সরকারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য সৃষ্টি করে।


১৪. স্থানীয় সরকার

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা শুধু কেন্দ্রীয় সরকারে সীমাবদ্ধ নয়।

সংবিধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন—

  • ইউনিয়ন পরিষদ
  • উপজেলা পরিষদ
  • জেলা পরিষদ
  • পৌরসভা
  • সিটি করপোরেশন

আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব

স্থানীয় সরকার—

  • স্থানীয় উন্নয়ন পরিচালনা করে;
  • নাগরিক সেবা প্রদান করে;
  • স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ায়;
  • স্থানীয় সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখে।

১৫. কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক

বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র হওয়ায় সার্বভৌম ক্ষমতা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের অধীনে থাকে।

তবে জনগণের স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে।

এখানে পার্থক্যটি হলো—

কেন্দ্রীয় সরকার:
জাতীয় নীতি, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, মুদ্রা, জাতীয় আইন ইত্যাদি।

স্থানীয় সরকার:
স্থানীয় অবকাঠামো, নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন ইত্যাদি।


১৬. প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র

সরকারের নীতিকে বাস্তবে বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • মন্ত্রণালয়
  • বিভাগ
  • অধিদপ্তর
  • জেলা প্রশাসন
  • উপজেলা প্রশাসন
  • বিভিন্ন সরকারি সংস্থা

প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা রাজনৈতিকভাবে নীতি নির্ধারণ করলেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেই নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।


১৭. সরকারি কর্ম কমিশন

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (BPSC) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা রয়েছে।

এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোকে পেশাদার জনবল সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


১৮. মহাহিসাব–নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক

রাষ্ট্রের সরকারি অর্থের ব্যবহার পরীক্ষা ও নিরীক্ষার জন্য সংবিধানে মহাহিসাব–নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (CAG) পদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের ব্যয় ও হিসাবের ওপর সাংবিধানিক নিরীক্ষা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা তৈরি হয়।


১৯. বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থায় জনগণের ভূমিকা

গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় জনগণ হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস।

জনগণ—

ভোট দেয়
↓
প্রতিনিধি নির্বাচন করে
↓
সংসদ গঠিত হয়
↓
সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয়
↓
সরকার জনগণের জন্য নীতি ও আইন বাস্তবায়ন করে
↓
পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের সুযোগ পায়।

এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক রাজনৈতিক চক্র।


২০. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পার্থক্য

বিষয়রাষ্ট্রপতিপ্রধানমন্ত্রী
সাংবিধানিক পরিচয়রাষ্ট্রপ্রধানসরকারপ্রধান
নির্বাচন/নিয়োগসংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিতরাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন
মূল ভিত্তিসাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানসংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন
নির্বাহী ক্ষমতাসীমিত/সাংবিধানিকনির্বাহী ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র
মন্ত্রিসভার নেতৃত্বনাহ্যাঁ
সংসদের কাছে সরাসরি রাজনৈতিক দায়সাধারণত নয়হ্যাঁ
সরকারের দৈনন্দিন নেতৃত্বনাহ্যাঁ

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই সরকারের নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালিত হয়।


২১. সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার পার্থক্য

বিষয়সংসদীয় ব্যবস্থারাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা
সরকারপ্রধানপ্রধানমন্ত্রীরাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপ্রধানআলাদা হতে পারেসাধারণত রাষ্ট্রপতিই
সরকার গঠনের ভিত্তিসংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাসাধারণত রাষ্ট্রপতির নির্বাচনী ম্যান্ডেট
মন্ত্রিসভার দায়সংসদের কাছেসাধারণত রাষ্ট্রপতির কাছে
সরকার পতনসংসদের আস্থা হারালে সম্ভবসাধারণত এভাবে হয় না
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থাসংসদীয়নয়

২২. বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার ঐতিহাসিক পরিবর্তন

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তন হয়েছে।

১৯৭২

সংবিধানের মূল কাঠামোতে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭৫

চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয় এবং রাষ্ট্রপতি-প্রধান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯১

দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। সরকারি সংবিধান-পাঠে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে।

এর পর থেকে সংসদীয় কাঠামোই বাংলাদেশের সাংবিধানিক সরকারব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে রয়েছে।


২৩. বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার একটি সহজ কাঠামো

                    জনগণ

                      │

                   নির্বাচন

                      │

                জাতীয় সংসদ

                      │

          ┌───────────┴───────────┐

          │                       │

      সংখ্যাগরিষ্ঠ দল        বিরোধী দল

          │

          ▼

      প্রধানমন্ত্রী

          │

          ▼

       মন্ত্রিসভা

          │

          ▼

     নির্বাহী প্রশাসন

অন্যদিকে—

জনগণ

  │

  └── নির্বাচিত সংসদ

           │

           ├── আইন প্রণয়ন

           ├── বাজেট অনুমোদন

           └── সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা

বিচার বিভাগ

  │

  ├── আইন ব্যাখ্যা

  ├── বিচার

  └── মৌলিক অধিকার ও সাংবিধানিক প্রতিকার


২৪. সরকারব্যবস্থার প্রধান সাংবিধানিক ভিত্তি

পরীক্ষার জন্য কয়েকটি অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

অনুচ্ছেদবিষয়
৭জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের সর্বোচ্চতা
১১গণতন্ত্র ও মানবাধিকার
৪৮রাষ্ট্রপতি
৫৫মন্ত্রিসভা ও নির্বাহী ক্ষমতা
৫৬প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী নিয়োগ
৫৭প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ
৬৫জাতীয় সংসদ
৬৬সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা
৭২সংসদের অধিবেশন
৭৪স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার
৯৪সুপ্রিম কোর্ট
১০২হাইকোর্টের রিট/সাংবিধানিক প্রতিকার
১১৮নির্বাচন কমিশন
১২৭মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক
১৩৭সরকারি কর্ম কমিশন
১৪২সংবিধান সংশোধন

২৫. বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার গুরুত্ব

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা কয়েকটি মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণ করে।

গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব

জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে।

জবাবদিহি

মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ।

ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ

রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরস্পরের ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য সৃষ্টি করে।

আইনের শাসন

সরকারসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংবিধান ও আইনের অধীন।

নাগরিক অধিকার

সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেয়।

প্রশাসনিক কার্যকারিতা

কেন্দ্রীয় সরকার থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।


উপসংহার

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো সংসদীয় গণতন্ত্র। এখানে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান এবং মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়ী। জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ আইন ও নীতি বাস্তবায়ন করে এবং বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা ও বিচারকার্য পরিচালনা করে। নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করে। এই কাঠামোর সাংবিধানিক ভিত্তি বিশেষভাবে ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর পর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় স্পষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *