বাংলাদেশের জলবায়ু: বিস্তারিত আলোচনা
বাংলাদেশের জলবায়ু: বিস্তারিত আলোচনা
১. ভূমিকা
বাংলাদেশের জলবায়ু মূলত উষ্ণমণ্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ু (Tropical Monsoon Climate)। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী অবস্থান, মৌসুমি বায়ু, বিস্তৃত নদ-নদী, সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি নিম্নভূমি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু সাধারণত উষ্ণ, আর্দ্র ও বৃষ্টিপ্রবণ।
বাংলাদেশের জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—বছরের বিভিন্ন সময়ে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা ও বায়ুর দিকের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।
২. বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
- উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া
- মৌসুমি বায়ুর প্রভাব
- বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত
- গ্রীষ্মকালে উচ্চ তাপমাত্রা
- শীতকালে তুলনামূলক শুষ্ক ও শীতল আবহাওয়া
- উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব
- কালবৈশাখী ও বজ্রঝড়ের প্রবণতা
- অঞ্চলভেদে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পার্থক্য
- বন্যা ও নদীভাঙনের সঙ্গে জলবায়ুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন
৩. বাংলাদেশের ঋতুভিত্তিক জলবায়ু
বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ছয়টি ঋতু রয়েছে। তবে জলবায়ুবিদ্যার দৃষ্টিতে সাধারণভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়াকে তিনটি প্রধান মৌসুমে ভাগ করা যায়—
| মৌসুম | সময়কাল | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
| গ্রীষ্ম/প্রাক-মৌসুমি | মার্চ–মে | উষ্ণতা, কালবৈশাখী, বজ্রঝড় |
| বর্ষা/মৌসুমি | জুন–অক্টোবর | প্রচুর বৃষ্টি, আর্দ্রতা |
| শীত/শুষ্ক মৌসুম | নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি | শুষ্ক, তুলনামূলক ঠান্ডা |
৪. গ্রীষ্মকালীন জলবায়ু
মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও প্রাক-মৌসুমি সময় বিরাজ করে।
তাপমাত্রা
এ সময় সূর্যের তাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ে। এপ্রিল ও মে মাস সাধারণত বছরের উষ্ণ সময়ের মধ্যে পড়ে।
বিশেষ করে দেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গরম বেশি অনুভূত হতে পারে।
কালবৈশাখী
গ্রীষ্মের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো কালবৈশাখী ঝড়।
এগুলো সাধারণত—
- বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে সৃষ্টি হয়;
- স্বল্প সময়ে প্রবল বাতাস সৃষ্টি করতে পারে;
- বজ্রপাত ও বৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত থাকে;
- কখনো শিলাবৃষ্টিও ঘটতে পারে।
কালবৈশাখী কৃষির জন্য কখনো উপকারী বৃষ্টিপাত আনলেও ঝড় ও বজ্রপাতের কারণে ক্ষয়ক্ষতিও হতে পারে।
৫. বর্ষাকালীন জলবায়ু
জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে।
এ সময় বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—
- প্রচুর বৃষ্টিপাত;
- উচ্চ আর্দ্রতা;
- মেঘাচ্ছন্ন আকাশ;
- নদ-নদীর পানির প্রবাহ বৃদ্ধি;
- নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার সম্ভাবনা।
মৌসুমি বায়ু
ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আর্দ্র বায়ু বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়। এই আর্দ্র মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রচুর জলীয়বাষ্প নিয়ে আসে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়।
বৃষ্টিপাতের আঞ্চলিক পার্থক্য
বাংলাদেশে সর্বত্র সমান পরিমাণ বৃষ্টি হয় না।
সাধারণভাবে—
- সিলেট ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি;
- দেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়;
- পশ্চিম ও উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বৃষ্টিপাত কম।
৬. শরৎকাল
বাংলা ঋতু অনুযায়ী ভাদ্র ও আশ্বিন মাসকে শরৎকাল বলা হয়।
এ সময় বর্ষার প্রবলতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আকাশে সাদা মেঘ দেখা যায় এবং অনেক অঞ্চলে আবহাওয়া তুলনামূলক পরিষ্কার হতে শুরু করে।
তবে বর্ষার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
৭. হেমন্তকাল
কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসকে হেমন্তকাল বলা হয়।
এ সময়—
- বৃষ্টিপাত কমে;
- আর্দ্রতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়;
- রাত ও ভোরে ঠান্ডা অনুভূত হতে শুরু করে;
- আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে।
এটি বর্ষা ও শীতের মধ্যবর্তী পরিবর্তনকাল।
৮. শীতকাল
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে শীতকালীন বা শুষ্ক মৌসুম বিরাজ করে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- বৃষ্টিপাত খুব কম;
- আকাশ সাধারণত পরিষ্কার;
- বাতাসে আর্দ্রতা তুলনামূলক কম;
- রাত ও ভোরে তাপমাত্রা কমে যায়;
- দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শীত বেশি অনুভূত হয়।
শৈত্যপ্রবাহ
শীতকালে মাঝে মাঝে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঠান্ডা বায়ু প্রবেশ করলে শৈত্যপ্রবাহ সৃষ্টি হতে পারে।
এ সময় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে এবং কুয়াশা বৃদ্ধি পেতে পারে।
৯. তাপমাত্রা
বাংলাদেশের তাপমাত্রার ওপর কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলে—
- অক্ষাংশ;
- সমুদ্রের নৈকট্য;
- উচ্চতা;
- মৌসুমি বায়ু;
- মেঘ ও বৃষ্টিপাত;
- ভূপ্রকৃতি;
- নগরায়ণ।
সাধারণভাবে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বেশি এবং শীতে কম থাকে।
অঞ্চলভেদে পার্থক্য
পশ্চিম ও উত্তর–পশ্চিমাঞ্চল:
গ্রীষ্মে বেশি উষ্ণ এবং শীতকালে তুলনামূলক বেশি ঠান্ডা হতে পারে।
উপকূলীয় অঞ্চল:
সমুদ্রের প্রভাবের কারণে তাপমাত্রার দৈনিক ও ঋতুভিত্তিক ওঠানামা তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
পার্বত্য অঞ্চল:
উচ্চতার কারণে কিছু স্থানে তুলনামূলকভাবে শীতল পরিবেশ দেখা যায়।
১০. বৃষ্টিপাত
বাংলাদেশের জলবায়ুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মৌসুমি বৃষ্টিপাত।
বার্ষিক বৃষ্টিপাতের একটি বড় অংশ বর্ষাকালে সংঘটিত হয়।
বৃষ্টিপাতের কারণ
১. দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু
২. বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্প
৩. নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়
৪. পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির প্রভাব
৫. স্থানীয় বজ্রঝড়
সিলেট অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাতের কারণ
সিলেট ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পাহাড় ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আর্দ্র বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ঊর্ধ্বমুখী হয়। ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হতে পারে।
১১. আর্দ্রতা
বাংলাদেশে বিশেষ করে বর্ষাকালে বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে আপেক্ষিক আর্দ্রতা সাধারণত বেশি অনুভূত হয়।
উচ্চ আর্দ্রতার কারণে—
- গরম বেশি অনুভূত হতে পারে;
- ঘাম বেশি হয়;
- কাপড় ও বিভিন্ন সামগ্রী শুকাতে বেশি সময় লাগে;
- ছত্রাক ও কিছু রোগজীবাণুর বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
১২. মৌসুমি বায়ুর ভূমিকা
বাংলাদেশের জলবায়ু বোঝার জন্য মৌসুমি বায়ু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শীতকাল
স্থলভাগ তুলনামূলক দ্রুত ঠান্ডা হয়ে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে। ফলে শুষ্ক বায়ুপ্রবাহের প্রাধান্য থাকে।
গ্রীষ্মকাল
স্থলভাগ উত্তপ্ত হয়ে নিম্নচাপ সৃষ্টি করে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আর্দ্র বায়ু স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়।
ফলে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
সহজভাবে:
সমুদ্র → আর্দ্র মৌসুমি বায়ু → বাংলাদেশ → মেঘ → বৃষ্টিপাত
১৩. বঙ্গোপসাগরের প্রভাব
বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। ফলে সমুদ্র বাংলাদেশের জলবায়ুকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
এর প্রভাব হলো—
- বাতাসে জলীয়বাষ্প বৃদ্ধি;
- মৌসুমি বৃষ্টিপাত;
- উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রার ভারসাম্য;
- ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি ও প্রভাব;
- জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি।
১৪. ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস
বঙ্গোপসাগর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। উপকূলীয় বাংলাদেশ তাই ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকে।
ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—
- প্রবল বাতাস;
- ভারী বৃষ্টিপাত;
- জলোচ্ছ্বাস;
- উপকূলীয় প্লাবন;
- লবণাক্ততা বৃদ্ধি;
- ফসল ও অবকাঠামোর ক্ষতি।
বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কতা এবং উপকূলীয় বাঁধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৫. জলবায়ু ও নদ–নদী
বাংলাদেশের নদীবহুল ভূপ্রকৃতি জলবায়ুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির ফলে—
বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি → নদীর পানি বৃদ্ধি → নিম্নাঞ্চল প্লাবিত → বন্যার সম্ভাবনা বৃদ্ধি
আবার শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় অনেক নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায়।
১৬. জলবায়ু ও কৃষি
বাংলাদেশের কৃষি মৌসুমি জলবায়ুর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
জলবায়ুর ইতিবাচক প্রভাব
- পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত;
- উর্বর পলিমাটি;
- দীর্ঘ চাষাবাদ মৌসুম;
- ধান, পাট, চা, গম, সবজি ও বিভিন্ন ফল উৎপাদনের সুযোগ।
নেতিবাচক প্রভাব
অতিরিক্ত—
- বৃষ্টি;
- বন্যা;
- খরা;
- ঘূর্ণিঝড়;
- লবণাক্ততা;
- তাপমাত্রা বৃদ্ধি
কৃষির ক্ষতি করতে পারে।
১৭. জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে।
| দুর্যোগ | জলবায়ু/আবহাওয়ার সম্পর্ক |
| বন্যা | অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধি |
| ঘূর্ণিঝড় | বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় |
| জলোচ্ছ্বাস | ঘূর্ণিঝড় ও উপকূলীয় সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি বৃদ্ধি |
| খরা | দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব |
| কালবৈশাখী | প্রাক-মৌসুমি অস্থির আবহাওয়া |
| বজ্রঝড় | শক্তিশালী পরিচলন ও মেঘমালা |
| ভূমিধস | অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢাল |
| নদীভাঙন | প্রবল স্রোত, বন্যা ও নদীর গতিপথ পরিবর্তন |
১৮. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশের জলবায়ু নিয়ে আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে—
১. তাপমাত্রা বৃদ্ধি
অতিরিক্ত গরমের দিন ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২. বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন
বৃষ্টিপাতের সময়, তীব্রতা ও স্থানভেদে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
৩. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
উপকূলীয় নিম্নভূমিতে প্লাবন ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৪. ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতির ঝুঁকি
উপকূলীয় জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
৫. কৃষিতে প্রভাব
তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বন্যা ও লবণাক্ততার পরিবর্তন ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
৬. জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব
বন, জলাভূমি, উপকূলীয় পরিবেশ ও বিভিন্ন প্রজাতির আবাসস্থল পরিবর্তিত হতে পারে।
১৯. বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু
| অঞ্চল | সাধারণ জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য |
| উত্তর-পশ্চিম | তুলনামূলক শুষ্ক ও গ্রীষ্মে উষ্ণ |
| উত্তর-পূর্ব/সিলেট | অধিক বৃষ্টিপ্রবণ |
| মধ্যাঞ্চল | মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও মাঝারি জলবায়ু |
| দক্ষিণ-পশ্চিম | উপকূলীয় প্রভাব ও লবণাক্ততার ঝুঁকি |
| দক্ষিণ-পূর্ব | বৃষ্টিপ্রবণ ও পাহাড়-সমুদ্রের প্রভাব |
| উপকূলীয় অঞ্চল | সমুদ্র, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব |
| পার্বত্য অঞ্চল | উচ্চতা ও পাহাড়ের কারণে স্থানীয় বৈচিত্র্য |
২০. জলবায়ুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাত জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল।
কৃষি
ধান, পাট, চা, গম, সবজি ও ফল উৎপাদনে জলবায়ু গুরুত্বপূর্ণ।
মৎস্য
নদী, হাওর, বিল, উপকূল ও সমুদ্রের পরিবেশ মৎস্য উৎপাদনে সহায়তা করে।
বন
উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু বিভিন্ন ধরনের বন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য উপযোগী।
পর্যটন
সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য পর্যটন অঞ্চলের পরিবেশ জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
২১. জলবায়ু ও জনজীবন
জলবায়ু মানুষের—
- পোশাক;
- খাদ্যাভ্যাস;
- বাসস্থান;
- কৃষিকাজ;
- কর্মসংস্থান;
- যাতায়াত;
- স্বাস্থ্য;
- দৈনন্দিন জীবনযাত্রা
প্রভাবিত করে।
বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও বন্যা মানুষের চলাচল ও কাজকর্মে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আবার শীতকালে উত্তরাঞ্চলে কুয়াশা যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
২২. জলবায়ু ও স্বাস্থ্য
অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা মানুষের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বর্ষাকালে পানি ও পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে কিছু পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে—
- তাপজনিত অসুস্থতা;
- পানিবাহিত রোগ;
- মশাবাহিত রোগ;
- অপুষ্টি;
- দুর্যোগ-সম্পর্কিত স্বাস্থ্যঝুঁকি
বাড়তে পারে।
২৩. জলবায়ু ও পরিবেশ সংরক্ষণ
জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো—
- বনায়ন ও বন সংরক্ষণ
- নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ
- দূষণ নিয়ন্ত্রণ
- নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি
- জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার
- পরিবেশবান্ধব কৃষি
- উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী রক্ষা
- দুর্যোগের আগাম সতর্কতা শক্তিশালী করা
- জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো তৈরি
- জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি
২৪. জলবায়ুর সংক্ষিপ্ত কাঠামো
বাংলাদেশের জলবায়ু
│
┌────────────┼────────────┐
│ │ │
গ্রীষ্ম বর্ষা শীত
│ │ │
তাপমাত্রা ↑ বৃষ্টিপাত ↑ বৃষ্টিপাত ↓
কালবৈশাখী আর্দ্রতা ↑ শুষ্কতা ↑
│ │ │
└────────────┼────────────┘
│
মৌসুমি বায়ু
│
বঙ্গোপসাগরের প্রভাব
│
┌─────────────┼─────────────┐
│ │ │
কৃষি নদী-বন্যা দুর্যোগ
│ │ │
└─────────────┼─────────────┘
│
জলবায়ু পরিবর্তন
২৫. পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- বাংলাদেশের জলবায়ু মূলত উষ্ণমণ্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ু।
- বাংলাদেশের জলবায়ুতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- বর্ষাকালে দেশের অধিকাংশ বার্ষিক বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়।
- বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জলবায়ুতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
- সিলেট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল তুলনামূলকভাবে অধিক বৃষ্টিপ্রবণ।
- উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তুলনামূলকভাবে শুষ্ক ও গ্রীষ্মে বেশি উষ্ণ হতে পারে।
- গ্রীষ্মে কালবৈশাখী একটি উল্লেখযোগ্য আবহাওয়াগত ঘটনা।
- উপকূলীয় বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকে।
- জলবায়ু বাংলাদেশের কৃষি, নদী, বন, মৎস্য ও জনজীবনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠ ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের জলবায়ু তার ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগর, মৌসুমি বায়ু, নদ-নদী ও ভূপ্রকৃতির সম্মিলিত প্রভাবে গড়ে উঠেছে। উষ্ণতা, আর্দ্রতা, মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং ঋতুভেদে আবহাওয়ার পরিবর্তন বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই জলবায়ু যেমন কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিও সৃষ্টি করে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।