বিভক্তি কাকে বলে? বিভক্তি কত প্রকার ও কি কি?
বাক্যে একটি পদের সঙ্গে অপর একটি পদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং বাক্যটিকে সুসজ্জিত করে তোলার জন্য যে বর্ণগুলি ব্যবহার করা হয় সেগুলিকেই বলা হয় বিভক্তি।
সংস্কৃত ব্যাকরণে পাঁচ প্রকার প্রত্যয়ের একটি হলো- বিভক্তি। এই প্রত্যয়গুলি ক্রিয়ামূলের সাথে যুক্ত হয়ে কাল ও পুরুষভেদে ক্রিয়াপদ সৃষ্টি করে এবং বাক্যস্থ পদের সাথে যুক্ত হয়ে বাক্যের অন্যান্য পদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে।
বিভক্তির প্রকারভেদ
বাংলা বিভক্তি দুই প্রকার।
নাম বিভক্তি বা শব্দ বিভক্তি
ক্রিয়া বিভক্তি
নাম বিভক্তি
০ (শূন্য) বিভক্তি (অথবা, -অ বিভক্তি), -এ (-য়), -তে (-এ), -কে, -রে, -র (-এরা) – এ কয়টিকে বাংলা নাম বিভক্তি বা শব্দ বিভক্তি হিসাবে গণ্য করা হয়। এছাড়াও বিভক্তি স্থানীয় কয়েকটি অব্যয় পদও কারক-সম্বন্ধ নির্ণয়ের জন্য বাংলায় প্রচলিত রয়েছে। যেমন: -দ্বারা, -দিয়ে, -হতে, -থেকে, -চেয়ে ইত্যাদি। বাংলা শব্দ বিভক্তি বা নাম বিভক্তি কারক নির্দেশ করে বলে এগুলোকে কারক বিভক্তি বলা হয়।
বাংলা শব্দ-বিভক্তি সাত প্রকার।
| বিভক্তি | একবচন | বহুবচন |
| প্রথমা | ০, -অ, -এ (-য়), -তে, -এতে | -রা, -এরা, -গুলি (-গুলো), -গণ |
| দ্বিতীয়া | ০, -অ, -কে, -রে (-এরে), -এ, -য়, -তে | -দিগকে, -দিগকে, -দিগেরে, -দের |
| তৃতীয়া | ০, -অ, -এ, -তে, -দ্বারা, -দিয়া (-দিয়ে), -কর্তৃক | -দিগের দিয়া, -দের দিয়া, -দিগকে দ্বারা, -দিগ কর্তৃক, -গুলির দ্বারা, -গুলিকে দিয়ে, -গুলো দিয়ে, -গুলি কর্তৃক, -দের দিয়ে |
| চতুর্থী | দ্বিতীয়ায় অনুরূপ | দ্বিতীয়ায় অনুরূপ |
| পঞ্চমী | -এ (-যে, -য়), -হইতে, -থেকে, -চেয়ে, -হতে | -দিগ হইতে, -দের হইতে, -দিগের চেয়ে, -গুলি হইতে, -গুলির চেয়ে, -দের হতে, -দের থেকে, -দের চেয়ে |
| ষষ্ঠী | -র, -এর। | -দিগের, -দের, -গুলির, -গণের, -গুলোর |
| সপ্তমী | -এ (-য়), -তে, -এতে | -ডিগে, -ডিগেতে, -গুলিতে, -গণে, -গুলির মধ্যে, -গুলোতে, -গুলোর মধ্যে |
ক্রিয়া বিভক্তি
ক্রিয়ামূলের সঙ্গে যেসব লগ্নক যুক্ত হয়ে ক্রিয়ার কাল ও পক্ষ নির্দেশিত হয়, সেগুলোকে ক্রিয়া বিভক্তি বলে। অধিকাংশ বাংলা ক্রিয়ার দুটি রূপ আছে: সাধারণ রূপ ও প্রযোজক রূপ। উভয় রূপের সঙ্গে যুক্ত ক্রিয়াবিভক্তি রূপ আলাদা।
উদাহরণ:
* পড়ছি (√পড়্ + ছি)
ক্রিয়ার এই রূপটি থেকে বোঝা যায় যে, এই ক্রিয়ার কর্তা বক্তা পক্ষের এবং এটা দিয়ে ঘটমান বর্তমান কালের পড়া ক্রিয়াকে বোঝায়।
* পড়বেন (√পড়্ + বেন)
ক্রিয়ার এই রূপটি থেকে বোঝা যায় যে, এই ক্রিয়ার কর্তা শ্রোতা পক্ষের এবং এটা দিয়ে সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের পড়া ক্রিয়াকে বোঝায়।
* পড়েছিল (√পড়্ + ছিল)
ক্রিয়ার এই রূপটি থেকে বোঝা যায় যে, এই ক্রিয়ার কর্তা অন্য পক্ষের এবং এটা দিয়ে সাধারণ অতীত কালের পড়া ক্রিয়াকে বোঝায়।
উপরে ‘√’ চিহ্ন দিয়ে ক্রিয়ামূল বা ধাতু নির্দেশ করা হয়েছে।
বিভক্তি যোগের নিয়ম
- অ-প্রাণী বা ইতর প্রাণীবাচক শব্দের বহুবচনে -গুলি, -গুলো যুক্ত হয়। যেমন: পাথরগুলো, গরুগুলি।
- অ-প্রাণীবাচক শব্দের উত্তরে ০ (শূন্য) বিভক্তি হয়। যেমন: কলম দাও।
- স্বরান্ত শব্দ, অর্থাৎ যে শব্দগুলো কোনো স্বরধ্বনি নিয়ে শেষ হয়, এ ধরনের শব্দের উত্তর -এ বিভক্তির রূপভেদ হয় -য় বা -য়ে। -এ স্থানে -তে বিভক্তিও যুক্ত হতে পারে। যেমন: মা + -এ = মায়ের, ঘোড়া + -এ = ঘোড়ায়, পানি + -তে = পানিতে।
- অ-কারান্ত ও ব্যঞ্জনান্ত শব্দ, অর্থাৎ যে শব্দগুলো ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে শেষ হয়, এ ধরনের শব্দের উত্তরে প্রায়ই -রা স্থানে -এরা হয় এবং ষষ্ঠী বিভক্তি -র স্থানে -এর যুক্ত হয়। যেমন: লোক + -রা = লোকেরা, বিদ্বান (ব্যঞ্জনান্ত) + -রা = বিদ্বানেরা, মানুষ + -এর = মানুষের। কিন্তু অ-কারান্ত, আ-কারান্ত এবং এ-কারান্ত খাঁটি বাংলা শব্দের ষষ্ঠীর একবচনে সাধারণত -র যুক্ত হয়, -এর যুক্ত হয় না। যেমন: বড়র, মামার, ছেলের।
- সাধারণত ক্রিয়ার স্থান, কাল, ভাব বোঝাতে -এ, -তে, -য়, -য়ে ইত্যাদি বিভক্তির ব্যবহার হয়। কখনো কখনো বাক্যের কর্তার সঙ্গেও এসব বিভক্তি বসে।
- যেসব শব্দের শেষে কারচিহ্ন নেই, সেসব শব্দের সঙ্গে -এ বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন: সকালে, দিনাজপুরে, ই-মেইলে, কম্পিউটারে, জঙ্গলে, তিলে ইত্যাদি।
- শব্দের শেষে ই-কার ও উ-কার থাকলে -তে বিভক্তি হয়। যেমন: হাতিতে, রাত্রিতে, মধুতে, ইত্যাদি।
- আ-কারান্ত শব্দের শেষে -য় বিভক্তি হয়। যেমন: ঘোড়ায়, সন্ধ্যায়, ঢাকায়, কলকাতায় ইত্যাদি।
- শব্দের শেষে দ্বিযোগ (স্বরধ্বনির দুইবার উচ্চারণ) থাকলে -য়ে বিভক্তি হয়। যেমন: ছাইয়ে, ভাইয়ে, বউয়ে।
- ই-কারান্ত শব্দের শেষেও -য়ে বিভক্তি দেখা যায়। যেমন: দিয়ে, ধিয়ে।
- বাক্যে গৌণকর্মের সঙ্গে সাধারণত এক এবং -এর বিভক্তি বসে। ক্রিয়াকে ‘কাকে’ প্রশ্ন করলে যে উত্তর (শব্দ) পাওয়া যায় তার সঙ্গে এই বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন: শিশুকে, দরিদ্রকে, আমাকে, আমারে ইত্যাদি।
- বাক্যের মধ্যে পরবর্তী শব্দের সঙ্গে সম্বন্ধ বোঝাতে পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে -র, -এর এবং -য়ের বিভক্তি যুক্ত হয়। সাধারণত আ-কারান্ত, ই/ঈ-কারান্ত ও উ/ঊ-কারান্ত শব্দের শেষে -র বিভক্তি বসে। যেমন: রাজার প্রজার, যতির, বুদ্ধিজীবীর, তনুর, বধুর।
- যেসব শব্দের শেষে কারচিহ্ন নেই, সেসব শব্দের শেষে -এর বিভক্তি হয়। যেমন: বলের, শব্দের, নজরুলের, সত্যেশের ইত্যাদি।
- শব্দের শেষে দ্বিস্বর থাকলে -য়ের বিভক্তি হয়। যেমন: ভাইয়ের, বইয়ের, লাউয়ের, মৌয়ের ইত্যাদি।
বিভিন্ন কারকে বিভিন্ন বিভক্তির ব্যবহার
সকল কারকে প্রথমা বা শূন্য বিভক্তির ব্যবহার
| ক্রঃ | কারক | উদাহরণ |
| (ক) | কর্তৃকারক | রহিম বাড়ি যায়। |
| (খ) | কর্ম কারক | ডাক্তার ডাক। অর্থ অনর্থ ঘটায়। |
| (গ) | করণ কারক | ঘোড়াকে চাবুক মার। |
| (ঘ) | সম্প্রদান কারক | গুরুদক্ষিণা দাও। ভিক্ষা দাও দেখিলে ভিক্ষুক। |
| (ঙ) | অপাদান কারক | গাড়ি স্টেশন ছাড়ো। |
| (চ) | অধিকরণ কারক | সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। আকাশ মেঘে ঢাকা। |
সকল কারকে দ্বিতীয়া বিভক্তির ব্যবহার
| ক্রঃ | কারক | উদাহরণ |
| (ক) | কর্তৃকারক | বুলবুলিকে যেতে হবে। |
| (খ) | কর্ম কারক | তাকে বল। তাকে আমি চিনি। ধোপাকে কাপড় দাও। ‘আমারে তুমি করিবে ত্রাণ, এ নহে মোর প্রার্থনা।’ |
| (গ) | করণ কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (ঘ) | সম্প্রদান কারক | (সম্প্রদান কারকে চতুর্থী বিভক্তি হয়।) |
| (ঙ) | অপাদান কারক | বাবাকে বড্ড ভয় পাই। |
| (চ) | অধিকরণ কারক | ‘মন আমার নাচে রে আজিকে।’ |
সকল কারকে তৃতীয়া বিভক্তির ব্যবহার
| ক্রঃ | কারক | উদাহরণ |
| (ক) | কর্তৃকারক | ফেরদৌসী কর্তৃক শাহনামা রচিত হয়েছে। |
| (খ) | কর্ম কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (গ) | করণ কারক | লাঙল দ্বারা জমি চাষ করা হয়। মন দিয়া কর সবে বিদ্যা উপার্জন। আমরা কান দ্বারা শুনি। |
| (ঘ) | সম্প্রদান কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (ঙ) | অপাদান কারক | তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। |
| (চ) | অধিকরণ কারক | খিলিপান (এর ভিতর) দিয়ে ওষুধ খাবে। |
সকল কারকে চতুর্থী বিভক্তির ব্যবহার
| ক্রঃ | কারক | উদাহরণ |
| (ক) | কর্তৃকারক | (ব্যবহার নেই) |
| (খ) | কর্ম কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (গ) | করণ কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (ঘ) | সম্প্রদান কারক | ভিখারিকে ভিক্ষা দাও। দরিদ্রকে দান কর। |
| (ঙ) | অপাদান কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (চ) | অধিকরণ কারক | (ব্যবহার নেই) |
সকল কারকে পঞ্চমী বিভক্তির ব্যবহার
| ক্রঃ | কারক | উদাহরণ |
| (ক) | কর্তৃকারক | (ব্যবহার নেই) |
| (খ) | কর্ম কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (গ) | করণ কারক | এ সন্তান হতে দেশের মুখ উজ্জ্বল হবে। |
| (ঘ) | সম্প্রদান কারক | (ব্যবহার নেই) |
| (ঙ) | অপাদান কারক | জেলেরা নদী থেকে মাছ ধরছে। গাছ থেকে পাতা পড়ে। শক্তি থেকে মুক্তা মেলে। সুধ থেকে দই হয়। বিপদ থেকে বাঁচাও। সোমবার থেকে পরীক্ষা শুরু। |
| (চ) | অধিকরণ কারক | বাড়ি থেকে নদী দেখা যায়। |
সকল কারকে ষষ্ঠী বিভক্তির ব্যবহার
| ক্রঃ | কারক | উদাহরণ |
| (ক) | কর্তৃকারক | আমার যাওয়া হয়নি। |
| (খ) | কর্ম কারক | তোমার দেখা পেলাম না। দেশের সেবা কর। |
| (গ) | করণ কারক | তার মাথায় লাঠির আঘাত করো না। ইট–পাথরের বাড়ি শক্ত। ইটের বাড়ি সহজে ভাঙে না। |
| (ঘ) | সম্প্রদান কারক | ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দাও। |
| (ঙ) | অপাদান কারক | যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যে হয়। |
| (চ) | অধিকরণ কারক | (ব্যবহার নেই) |
সকল কারকে সপ্তমী বা এ বিভক্তির ব্যবহার
| ক্রঃ | কারক | উদাহরণ |
| (ক) | কর্তৃকারক | লোকে বলে। পাাগলে কী না বলে। |
| (খ) | কর্ম কারক | এ অধীনে দায়িত্ব অর্পণ করুন। কেরোসিন শিখা জ্বলে মাটির প্রদীপে। |
| (গ) | করণ কারক | এ কলমে লেখা ভালো হয়। হাতে না মেরে ভাতে মারো। |
| (ঘ) | সম্প্রদান কারক | তোমার এ জীবে আহার দিবে কে? দীনে দয়া কর। |
| (ঙ) | অপাদান কারক | আমি কি ডরাই সখি ভিখারি রাঘবে? |
| (চ) | অধিকরণ কারক | মেঘে বৃষ্টি হয়। এ দেহে প্রাণ নেই। তিলে আছে তেল, কুসুমে সৌরভ। |